| বঙ্গাব্দ
ad728
ad728

ঢাকা রিকশাচালকদের জীবনটা অদ্ভুত

রিপোর্টারের নামঃ banglatv24.com
ঢাকা রিকশাচালকদের জীবনটা অদ্ভুত
ছবির ক্যাপশন: ঢাকার রিক্সা চালকদের জীবনটা অদ্ভুত

ঢাকার রিকশাচালকদের জীবনটা অদ্ভুত। তারা সারাদিন হাজার হাজার মানুষ দেখে, কিন্তু রাতের ঢাকা তাদের কাছে অন্যরকম। বিশেষ করে খিলগাঁও-তিলপাপাড়া এলাকাটা যখন নতুন বসতি হচ্ছিল, তখন ল্যাম্পপোস্ট খুব একটা ছিল না। ঝিলগুলো ছিল গভীর আর ড্রেনের পানি সবসময় পচা গন্ধে ভারী হয়ে থাকত। ঘটনার নায়ক একজন বৃদ্ধ রিকশাচালক, নাম তার সোলায়মান চাচা। তিনি দীর্ঘ ৩৫ বছর এই এলাকায় রিকশা চালিয়েছেন। ২০১১ সালের এক শীতের রাতের সেই ঘটনার পর তিনি আর কোনোদিন রাত ১১টার পর রিকশা নিয়ে তিলপাপাড়ার ওই কালভার্ট দিয়ে যাননি।


সেদিন ছিল প্রচণ্ড শীত। কুয়াশায় খিলগাঁও রেলগেট এলাকাটা ঢেকে গিয়েছিল। সোলায়মান চাচা তখন খিলগাঁও মোড়ে রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাত তখন ১২টার কাছাকাছি। শরীর কাঁপছিল শীতের প্রকোপে। ভাবলেন গ্যারেজে ফিরে যাবেন। ঠিক তখনই একজন লোক ডাক দিল। পরনে সাধারণ শার্ট-প্যান্ট, কিন্তু লোকটার গায়ের রঙ ছিল মরা মানুষের মতো ফ্যাকাশে। সে বলল, "মামা, তিলপাপাড়া কালভার্টের কাছে যাবা? ২০ টাকা দেব।"

তখনকার সময়ে তিলপাপাড়া পর্যন্ত ২০ টাকা অনেক বেশি ছিল। সোলায়মান চাচা রাজি হয়ে গেলেন। লোকটা রিকশায় বসার সাথে সাথে সোলায়মান চাচার কেন যেন মনে হলো রিকশাটা হঠাৎ খুব ভারী হয়ে গেছে। যেন পেছনে একজন নয়, অন্তত তিন-চারজন মানুষ বসেছে। তিনি ভাবলেন টায়ারে হয়তো সমস্যা, তাই কষ্ট করে প্যাডেল মারতে শুরু করলেন।


রিকশা যখন তিলপাপাড়া ২ নম্বর রোডের মাথায় ঢুকল, তখন চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। কোনো কুকুরের ডাক নেই, ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ নেই এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। কুয়াশা এত বেশি যে সামনের ২ হাত দূরে কী আছে দেখা যাচ্ছে না। সোলায়মান চাচা লক্ষ্য করলেন, প্যাডেল মারতে তার জান বের হয়ে যাচ্ছে। রিকশা যেন কেউ পেছন থেকে টেনে ধরে আছে।

তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখলেন যাত্রী ঠিকঠাক বসে আছে কিনা। দেখলেন যাত্রী সোজা হয়ে বসে আছে, কিন্তু তার মাথাটা অস্বাভাবিকভাবে ডানে-বামে দুলছে। সোলায়মান চাচা ভাবলেন হয়তো ঝিমুচ্ছে। কিন্তু ঠিক যখন রিকশাটা সেই বিতর্কিত কালভার্টের ওপর উঠল, তখন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।


কালভার্টের মাঝখানে আসতেই সোলায়মান চাচা এক ভয়ংকর ঠান্ডা অনুভব করলেন। তার মনে হলো তার কানের একদম কাছে কেউ জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তিনি ভয়ে ব্রেক কষলেন। রিকশাটা থামিয়ে তিনি পেছনে তাকালেন যাত্রী নামবে কিনা দেখার জন্য।

কিন্তু রিকশার সিটটা একদম খালি! কেউ নেই সেখানে। সোলায়মান চাচা অবাক হলেন। যাত্রী কি মাঝরাস্তায় নেমে গেল? কিন্তু রিকশা তো চলছিল, আর নামলে তো রিকশার ঝাঁকুনি বোঝার কথা। তিনি রিকশা থেকে নেমে চারপাশ দেখলেন। কালভার্টের দুই পাশে কুচকুচে কালো ঝিলের পানি। কোথাও কোনো মানুষের চিহ্ন নেই।

ঠিক তখনই তিনি লক্ষ্য করলেন, রিকশার পেছনের সিটটা একেবারে ভেজা। যেন কেউ পুকুর থেকে উঠে এসে সেখানে বসেছিল। আর সেই ভেজা সিট থেকে নর্দমার পচা গন্ধ আসছে। সোলায়মান চাচার শরীর দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। তিনি দ্রুত রিকশা ঘুরিয়ে সেখান থেকে চলে আসার চেষ্টা করলেন।


রিকশা ঘুরাতেই সোলায়মান চাচা শুনলেন কালভার্টের নিচ থেকে কেউ তাকে ডাকছে। ঝরঝরে একটা আওয়াজ, যেন অনেকগুলো পাথর একসাথে ঘষা খাচ্ছে। আওয়াজটা বলল, "মামা, আমার ভাড়াটা নিয়ে যাও..."

সোলায়মান চাচা নিচে ঝিলের দিকে তাকাতেই দেখলেন, কালভার্টের রেলিং ধরে একটা হাত উঠে আসছে। মানুষের হাত নয় ওটা, চামড়া ঝুলে পড়া লম্বা লম্বা আঙুল। আর ল্যাম্পপোস্টের ক্ষীণ আলোতে তিনি দেখলেন পানির মাঝখানে সেই লোকটা দাঁড়িয়ে আছে যাকে তিনি রিকশায় তুলেছিলেন। কিন্তু এখন লোকটার শরীর থেকে মাংস খসে পড়ছে, আর তার চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে।

সোলায়মান চাচা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াননি। তিনি রিকশা ফেলে রেখে দৌড়ে বড় রাস্তার দিকে চলে আসেন। পেছনে শুধু শুনতে পেলেন এক বিকট অট্টহাসি, যা তিলপাপাড়ার নিস্তব্ধ রাতকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।


পরদিন সকালে সোলায়মান চাচা লোক নিয়ে সেখানে গিয়ে দেখেন তার রিকশাটা কালভার্টের ওপর উল্টে পড়ে আছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, রিকশার টায়ারের ভেতরে কোনো বাতাস নেই, অথচ টায়ার ফাটেওনি। রিকশার সিট কভারে নখের বড় বড় আঁচড় পড়ে আছে।

এলাকার পুরনো মুরুব্বিরা যখন ঘটনা শুনলেন, তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "বাবা, ওই কালভার্টটা আগে যেখানে ছিল, সেখানে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এক রিকশাচালককে ছিনতাইকারীরা খুন করে ঝিলে ফেলে দিয়েছিল। সেই থেকে ওই রিকশাচালক আজও রাতে যাত্রী সেজে অন্যের রিকশায় ওঠে। সে শুধু চায় কেউ যেন তাকে ওই অন্ধকার কালভার্ট থেকে উদ্ধার করে।"


তিলপাপাড়া এলাকায় যারা বড় হয়েছেন, তারা আজও বলেন মাঝরাতে যদি কেউ একা রিকশা নিয়ে ওই কালভার্ট পার হয়, তবে সে যেন ভুলেও পেছনে না তাকায়। কারণ অনেক সময় দেখা যায় রিকশা চলছে ঠিকই, কিন্তু সিটে বসা আছে এক অদৃশ্য ছায়া। 


আজও তিলপাপাড়ার অনেক রিকশাচালক রাতে ওই পথে যেতে চান না। তারা বিশ্বাস করেন, ওই কালভার্টটি শুধু একটি রাস্তা নয়, এটি একটি অতৃপ্ত আত্মার ঘর।


ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ad728
ad728
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ banglatv24.com | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ